বাংলায় একটা প্রবাদবাক্য রয়েছে " বৃক্ষ তোমার নাম কি? ফলে পরিচয়। ঠিক তেমনিই সারাবছরের পড়াশুনার ফল বহন করে পরীক্ষা। ছাত্রজীবনে সবাই পরীক্ষানামক ভয়ংকর বস্তুর সাথে পরিচিত। ভয়ংকর কেন বললাম? আসলে পরীক্ষাকে ভয় পায় না এমন মানুষ খুজে পাওয়া দুষ্কর। পরীক্ষা যেন ঠিক যমরাজের মত। শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড ।
আর এই শিক্ষা থেকে কি কি জ্ঞান অর্জন করতে সক্ষম হয়েছি পরীক্ষাই সেই জ্ঞানের পরিধি পরিমাপ করে। সারাবছর কি কি পড়া হলো তার একটি সূক্ষ পরিমাপ যাকে বলে আরকি। এর মানে তুমি যতই ভালো স্টুডেন্ট হও না কেন পরীক্ষায় ভালো নম্বর অথবা ভালো রেজাল্ট না করলে সবই যেন বৃথা হয়ে যাবে।
কিন্তু সারাবছর খুব পড়াশোনা করেও অনেক শিক্ষার্থী তাদের আশানুরূপ ফল পায় না। এর কারন হলো পরীক্ষার হলে উত্তরপত্র লেখার কিছু কৌশল অবলম্বন না কিরা। যার কারনে তাদের ফলাফল ভালো হয় না। ভালো রেজাল্ট করতে পড়াশুনার পাশাপাশি পরীক্ষায় লেখার কিছু টেকনিকও দরকার হয়।
নিচের ১০ টি কৌশল আয়ত্ত করে পরীক্ষায় উত্তরপত্র লেখার সময় প্রয়োগ করে পরীক্ষায় ভালো ফলাফল বয়ে আনা সম্ভব।
১। উত্তর পত্র সঠিক আছে কিনা ভালোভাবে চেক করা
পরিক্ষার্থীদের প্রথম কাজই হচ্ছে লেখা শুরু করারপূর্বে উত্তরপত্র যথাযথ আছে কিনা তা ভালোভাবে দেখে নেয়া বা চেক করা। ব্যাপারটা বেশ গুরুত্বপূর্ণ, কেননা কোন কোন সময় উত্তরপত্র ছেড়া থাকে বা পিন খোলা থাকে। লেখা বেশখানিক হয়ে যায় বলে পড়ে চেঞ্জ করার মত অবস্থা থাকে না। আর এ ধরণের উত্তরপত্র জমা দিলে অসদুপায় অবলম্বন করা হয়েছে বলে পরীক্ষক সন্দেহ করতে পারেন। যেটা পরীক্ষার্থীদের উপর প্রভাব ফেলে এবং কোন কোন সময় রেজাল্টেও সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে। তাই প্রথমেই উত্তরপত্র নেয়ার শুরুতেই এসব ব্যাপার চেক করে দেখা উচিৎ যাতে করে পরবর্তীতে ঝামেলার সম্মুখীন না হতে হয়।
২। উত্তরপত্রে রোলনম্বরসহ প্রয়োজনীয় তথ্য নির্ভুলভাবে লেখা
এই বিষয়টিও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরীক্ষার্থীকে উত্তরপত্রের নির্ধারিত স্থানে পরিষ্কারভাবে রোল নম্বর, রেজিস্ট্রেশন নম্বর, বিষয় কোডসহ প্রয়োজনীয় তথ্য ভালোভাবে লেখতে হবে ও সঠিকভাবে লেখা হয়েছে কিনা তা চেক করতে হবে এবং বৃত্ত সঠিকভাবে ভরাট করতে হবে । কখনও কখনও দেখা যায়, পরীক্ষার উত্তরপত্রে রোলনম্বর না লেখা, ভুল লেখা, সঠিকভাবে বৃত্ত ভরাট না করার কারণে পরীক্ষার খাতায় ভালো লিখেও নম্বর পাওয়া যায় না এবং কখনও কখনও ভুল রোল লেখা বা বৃত্ত সঠিকভাবে ভরাট না হওয়ার কারণে পরীক্ষার ফল স্থগিত হয়ে যায়। এ বিষয়ে পরীক্ষার্থীকে অত্যন্ত সজাগ ও সচেতন থাকতে হবে।
পড়ুন : স্বল্প পুজির ব্যবসার আইডিয়া
৩। পরিষ্কার হাতের লেখা
হাতের লেখা ভালো হতে হবে এমন কোন কথা নেই। তবে হাতের লেখা পরিষ্কারহতে হবে। বাংলায় একটি প্রবাদ আছে, “আগে দর্শনধারী পরে গুণবিচারী” অর্থাৎ প্রথমে দর্শনে ভালো হতে হবে পরে গুণের বিচার করা হবে। আর তাই পরীক্ষার খাতায় হাতের লেখা ভালো হলে পরীক্ষকের একটা আলাদা আকর্ষণ তৈরি হয়। সর্বোপরি, সুন্দর ও স্পষ্ট হাতের লেখা পরীক্ষার্থীর সম্পর্কে একটাইতিবাচক ধারণা তৈরী করে যার প্রভাব সম্পূর্ণ খাতার উপরেই পড়ে। কাটা-ছেঁড়া কম করার চেষ্টা করবে, কাটা গেলে একটান দিয়ে কাটবে।
একটি উদাহরণ থেকে বিষয়টি সহজেই উপলব্ধি করা যায়। যেমন -পাঁচ নম্বরের একটি প্রশ্নের একই উত্তর করে, একটি খারাপ হাতের লেখার উত্তরপত্রের চেয়ে একটি সুন্দর হাতের লেখার উত্তরপত্রের নম্বর যদি আধা নম্বরও বেড়ে যায়, তবে পঞ্চাশ পূর্ণমানের একটি পরীক্ষায় উভয় উত্তরপত্রের নম্বরের ব্যবধান হয় পাঁচ। অর্থাৎ একই উত্তর করে খারাপ হাতের লেখার উত্তরপত্র ৩৫ পেলে ভালো হাতের লেখার উত্তরপত্র পায় ৪০। এ থেকে প্রমাণিত হয় যে, ভালো হাতের লেখা এ প্লাস পাওয়া না পাওয়ায় ভূমিকা রাখতে পারে!
৪। প্রশ্নপত্র মনযোগ সহকারে পড়া
অনেকেই মনে করে প্রশ্নপত্র পড়ে কি লাভ? শুধু শুধু টাইম নষ্ট হয়। আর এসব ভেবেই তারা সম্পূর্ণ প্রশ্নপত্র না পড়েই লেখা শুরু করে দেয়। ফলে তাদের পরীক্ষার মাঝখানে সমস্যা ফেইস করে, এবং দেখা যায় তাতে সময় বেশি নষ্ট হয়। তাছাড়া না বুঝে ভুল উত্তর দেয়ারও ননিজ আছে। যার ফলে রেজাল্ট খারাপ হতে পারে। তাই মনযোগ সহকারে প্রথমেই প্রশ্নপত্র পড়ে নেয়াই উত্তম। এতে করে প্রশ্ন সম্পর্কে একটা ধারনা চলে আসে। তুলনামূলক কোনটা সহজ তার একটা সূক্ষ্ম পরিমাপ করা যায়। এবং উত্তর লেখার সময় বার বার লেখা থামিয়ে প্রশ্ন বুঝতে হয় না। ফলশ্রুতি সময়ও সাশ্রয় এবং নির্ভুল উত্তর হয়।
৫। প্যারা করে লেখা
পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করতে হলে প্রশ্ন উত্তর কালে কিছু টেকনিক ব্যাবহার করতে হয়। এর মধ্যে যেমন পরিষ্কার হাতের লেখা জরুরী ঠিক তেমনি উত্তরপত্রে লেখা উপস্থাপনের ক্ষেত্রে আরেকটি দিক খেয়াল রেখে উত্তর করাযেতে পারে, তা হল প্যারা করে লেখা।
কেননা খাতা ভরে হিবিজিবি করে লিখলে শিক্ষকের চোখে মূল বিষয়বস্তুগুলো পরে না। যার ফলে ফলাফলে অনেক ইম্প্যাক্ট পরে। অপরদিকে প্যারা করে লিখলে একই সাথে তোমার উপস্থাপিত তথ্য ভালোভাবে শিক্ষকের চোখে পড়ে এবং তোমার উপস্থাপিততথ্যও সুস্পষ্টভাবে দৃষ্টিগোচর হয়। উত্তর লেখার সময় পয়েন্ট সহকারে প্যারা করে লিখতে হবে আর খেয়াল রাখতে হবে উভয় প্যারার মাঝে দূরত্ব লাইনের মধ্যবর্তী দূরত্বের দ্বিগুণ হবে।
৬। নানা রঙের কলম ও কালি ব্যবহার না করা
অনেকে পরীক্ষার খাতায় নানা রঙের কলম ও কালি ব্যবহার করে থাকে। এতে সময় যেমন নষ্ট হয় তেমনি খাতার উপস্থাপনার সৌন্দর্যও নষ্ট হয়। তাই তোমরা এ রকমটি করবে না। মার্জিন করার ক্ষেত্রে একটি ভালো মানের পেন্সিল ব্যবহার করবে। বিশেষ পয়েন্ট চিহ্নিত করার জন্য সবুজ, নীল বা হলুদ যে কোনো একটি অথবা তোমার লেখার কলম অথবা মার্জিনের পেন্সিলটিও ব্যবহার করতে পার। নানা রকম অতিরঞ্জিত কালি ব্যবহার করলে খাতার সৌন্দর্য নষ্ট হবে এবং তা নম্বর পাওয়াতেও প্রভাব ফেলতে পারে। লেখার সময় উপরে ও বামপাশে এক স্কেল এবং নিচে ও ডানপাশে হাফ স্কেল জায়গা ফাঁকা রাখতে হবে।
এসব ব্যাবহার না করলে যেমন সময় বাচাবে তেমনি খাতার সৌন্দর্য অক্ষুণ্ণ থাকবে। ফলশ্রুতি ভালো ফলাফল আসবে।
৭। সহজ প্রশ্নের উত্তর আগে লেখতে হবে
অনেকেই আগে কঠিন প্রশ্নের উত্তর দিয়ে থাকে এই ভেবে যে "সহজগুলো তো পারবোই"। কিন্তু এইটা করা যাবে না। কেননা কঠিন প্রশ্নের উত্তর দিতে অনেক ভাবরে হয়, প্রশ্ন ধরতে সময় লাগে, বন্ধুদের সাহায্য নিতে হয়, সাহায্যর জন্য বসে থাকতেও হয়। এসব করতে করতে কখন যে সময় পাড় হয়্র যায় সেটা টেরও পাওয়া যায় না। ফলে সহজ প্রশ্ন এবং নিজের জানা প্রশ্নের উত্তরের জন্যেও মাঝে মাঝে সময় থাকে না, থাকলেও কম সময় থাকে যে সময়টুকুতে সুন্দর মার্জিত এবং সম্পূর্ণ দেয়া সম্ভব হয়ে উঠে না। ফলে নম্বর আশানুরূপ পাওয়া যায় না। তাই প্রথমে সহজ প্রশ্নগুলো ঝটপট দিয়ে কঠিন প্রশ্নতে যাওয়া উচিৎ তাতে করে সময় ব্যালেন্স হয়ে সম্পূর্ণটুকু শেষ হয়ে যায়। এবং ফলাফল ও ভালো হয়।
৮। সময় বণ্টনের আলোকে উত্তর লেখা
পরীক্ষার্থীকে পূর্বেই নম্বরের আলোকে উত্তর লেখার সময় বন্টন করে নিতে হবে। পরীক্ষা হলে সময়টাই সব। কেননা, তুমি সব প্রশ্নের উত্তর জানো কিন্তু তুমি সেগুলো পরিমিত সময়ের মধ্যে শেষ করতে না পারো তাহলে সে জানার কোন মূল্যই রইবে না, কারন তোমার টাইম শেষ হওয়ার সাথে সাথেই পরীক্ষক খাতা নিয়ে নেবেন। তাই প্রত্যেক প্রশ্নের জন্য সময় বণ্টন এবং সেই সময়ের মধ্যে শেষ করার তাড়না থাকা প্রয়োজন। যেমন ধরো তোমার প্রশ্ন ৬ টা এবং এর জন্য টাইম ২ ঘন্টা ৩০ মিনিট। তাহলে দেখা যাচ্ছে একটা প্রশ্নের জন্য তুমি সময় পাচ্ছো ২৩-২৫ মিনিট (প্রত্যেক প্রশ্ন থেকে ২ মিনিট হাতে রাখার চেষ্টা করা উচিৎ) আর এই সময়ের মধ্যেই তোমাকে প্রশ্ন শেষ করতে হবে। এর আগে পারলে তোমার প্লাস পয়েন্ট কিন্তু এইটা কোনমতেই ক্রোস করার চিন্তা থাকা যাবে না। আর এভাবে সময় বন্টনের মাধ্যমে পরিক্ষা দিলে সব প্রশ্নেরই উত্তর দেয়া সম্ভব হয়।
৯। অপ্রয়োজনীয় লেখা থেকে বিরত থাকা
অনেকেরই এখন একটা ধারনা হয়ে গেছে যত বেশি পৃষ্ঠা ভরা যায় তত বেশি নম্বর পাওয়া যায়। তাই তারা অপ্রয়োজনীয় টপিক যা উত্তর পত্রের সাথে সংশ্লিষ্ট নয় অথবা যা উত্তর পত্রে দরকার নেই সেসব দিয়েও ভরে রাখে পৃষ্ঠা বাড়ানোর জন্য। আর যেটা সম্পূর্ণ ভুল। আর এই ভুলটাও অধিকাংশ পরীক্ষার্থীরাই করে। যার ফলে হিতে বিপরীত হয়। কেননা অপ্রয়োজনীয় জিনিষগুলো লিখতে গিয়ে তাদের অনেক সময় নষ্ট হচ্ছে। ফলে সব প্রশ্ন লেখার জন্য সময় থাকে না। ৪ টা প্রশ্নের উত্তর বড় বড় করে লিখতে গিয়ে দেখা যায় বাকি ২ টা প্রশ্ন ছেড়ে আসা লাগে টাইমের জন্য। ফলে গাদাগাদা লেখার ফলাফল তাদের নম্বরে বিরূপ প্রভাত ফেলে। তাই পৃষ্ঠা ভরার জন্য অপ্রাসঙ্গিক কথা না লিখে প্রাসঙ্গিক কথা সুন্দর করে লিখে দিয়ে আসলে সময়গুলোও বেচে যাবে এবং সকল প্রশ্নর উত্তর দেয়া সম্ভার হবে। এবং নম্বর তুলনা মূলক অনেক বেশি পাওয়া সম্ভব। একটা কথা মাথায় রাখবে "Don’t work hard, work smart.”
১০। আত্মবিশ্বাস
আত্মবিশ্বাস যেমন আমাদের সকল ক্ষেত্রেই সাফল্য এনে দেয় ঠিক তেমনি পরীক্ষার হলেও সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয়টি তা হল আত্মবিশ্বাস। পরীক্ষার আগে তুমি যা যা পড়েছো তা সঠিকভাবে খাতায় উপস্থাপন করে আসাটাই মাথায় রাখবে শুধু। আর কিছু নয়! যা শিখে গেলে তা যদি অতিরিক্ত টেনশনে ভুলে গিয়ে লিখে দিয়ে আসতে না পারো তাহলে লাভ নেই। পড়াশোনা আর পরীক্ষা শব্দ দুটি ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। একটিকে ছাড়িয়ে আরেকটি কল্পনা করা যায় না। পরীক্ষার হলে প্রশ্ন দেখে ঘাবড়ে যাওয়া যাবে না। আত্মবিশ্বাস রাখতে হবে।

0 Comments